Wednesday , February 28 2024
Breaking News

থানার টোকেন ছাড়া সন্দ্বীপে চলে না গাড়ি!

হুমায়ুন মাসুদ, সন্দ্বীপ থেকে ফিরে

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) থেকে অনুমতি পেলেই কেবল সড়কে মোটরযান নামানোর সুযোগ পাওয়া যায়। পাশাপাশি গাড়ি চালকেরও থাকতে হয় ড্রাইভিং লাইসেন্স। সড়কে মোটরযান নামানোর ক্ষেত্রে নিয়ম এরকম হলেও চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলায় তার বালাই নেই। মোটরসাইকেল থেকে শুরু করে ট্রাক, ইঞ্জিনচালি যেকোনও যানবাহনের ক্ষেত্রে লাগে কেবল থানার টোকেন। তবে থানা পুলিশ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

বিআরটিএ’র অনুমোদন এবং কোনও ধরনের রেজিস্ট্রেশন ছাড়াই এই দ্বীপে চলে মোটরযান। তবে এর জন্য মালিককে সন্দ্বীপ থানায় গাড়ির ধরনভেদে ভিন্ন ভিন্ন অঙ্কে টাকা দিয়ে হয়। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গাড়ির ধরন ভেদে থানায় নির্ধারিত টাকা দিলেই সড়কে যানবাহন যেমন চলতে পারে, অন্যদিকে টাকা দিলে গাড়িগুলোকে থানায় নিয়ে জব্দ করা হয়।

বাউরিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা আজগর হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দ্বীপে (সন্দ্বীপ) গাড়ি চালানোর জন্য কোনও রেজিস্ট্রেশন অথবা বিআরটিএ’র অনুমোদন নিতে হয় না। থানা থেকে টোকেন নিলে যেকোনও গাড়ি সড়কে চলাচল করতে পারে। এই ক্ষেত্রে থানায় প্রতি মাসে নির্ধারিত টাকা জমা দিতে হয়। না হলে অভিযান চালিয়ে গাড়িগুলো আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এই দ্বীপের ১৫টি ইউনিয়নে প্রায় ১০ হাজারের মতো মোটরসাইকেল আছে। এগুলোর প্রায় ৯৫ শতাংশেরই বিআরটিএ-র অনুমোদন নেই। থানার টোকেন নিয়েই এসব মোটরসাইকেল দ্বীপে চলাচল করছে।’ রেজিস্ট্রেশনবিহীন একটি মোটরসাইকেলের মাধ্যমে তিনি নিজেও গত তিন বছর ধরে যাত্রী আনা-নেওয়া করছেন বলে জানান।

সরেজমিনে দেখা যায়, সন্দ্বীপের প্রায় প্রতিটি মোড়ে ২০-২৫টি মোটরসাইকেল দাঁড়িয়ে থাকে। এসব মোটরসাইকেল ভাড়ায় যাত্রী আনা-নেওয়া করে। সন্দ্বীপে পাবলিক ট্রান্সপোর্টের ব্যবস্থা না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে মোটরসাইকেলই পাবলিক ট্রান্সপোর্ট হিসেবে চালানো হচ্ছে। এক ইউনিয়ন থেকে অপর ইউনিয়ন, এক বাজার থেকে অন্য বাজারে যাওয়ার ক্ষেত্রে এখানে মোটরসাইকেলই একমাত্র ভরসা। তবে সম্প্রতি কিছু সিএনজি অটোরিকশা চলাচল করছে। এগুলো সংখ্যায় বেশ কম।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সন্দ্বীপ উপজেলায় সড়কে মোটরযান চলাচলের অনুমতি পেতে প্রতিটি মোটরসাইকেলের বিপরীতে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা, সিএনজি’র জন্য ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা, ট্রাকের জন্য ৫ হাজার টাকা এবং ছোট ট্রাকের জন্য ২ থেকে তিন হাজার টাকা দিতে হয় পুলিশকে। পাশাপাশি প্রতিটি মোটরসাইকেলের বিপরীতে মালিককে প্রতি মাসে থানায় ৩০০ টাকা, সিএনজি মালিককে ২০০ টাকা, ট্রাক মালিককে ৫০০ টাকা এবং ট্রাক্টর-টলিকে ২০০ টাকা থানায় জমা দিতে হয়।

নিজের দু’টি ট্রাক আছে জানিয়ে নাজিরহাট বাজারের ব্যবসায়ী জাহিদ হাসান শাকিল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সন্দ্বীপ উপজেলায় ১০ থেকে ১২ হাজার মোটরসাইকেল, ৫০০টি সিএনজি অটোরিকশা, ২০০টি মাটি টানার ট্রাক আছে। এগুলো মধ্যে মোটরসাইকেল এবং সিএনজি অটোরিকশার প্রায় ৯৫ শতাংশেরই কোনও রেজিস্ট্রেশন নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নে ৫০ থেকে ৬০ হাজার পরিবার বসবাস করে। প্রত্যেক পরিবারেই কম বেশি একটা অথবা দুটো মোটরসাইকেল আছে।’ এর মধ্যে ৮০ শতাংশ মোটরসাইকেল ভাড়ায় যাত্রী আনা-নেওয়া করে বলে তিনি জানান। 

স্থানীয় একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্থানীয় নেতাদের ছত্রছায়ায় থাকা একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট মোটরসাইকেলগুলো চোরাইপথে এনে ক্রেতাদের হাতে তুলে দিচ্ছে। ওই সিন্ডিকেটের সদস্যরা ভারত থেকে মোটরসাইকেলগুলো এনে প্রথমে নোয়াখালী জেলার লক্ষ্মীরচরে রাখেন। পরে সেখান থেকে বোটে করে সন্দ্বীপে এনে ক্রেতাদের হাতে পৌঁছে দেন। অন্য মোটরযানগুলোও চট্টগ্রাম নগরী ও আশপাশের এলাকা থেকে একইভাবে নিয়ে আসেন। তবে এই ক্ষেত্রে সন্দীপ এনে রাস্তায় নামানোর আগেই থানায় জানাতে হয়। ৫-৬ হাজার টাকা দিয়ে প্রথমে রাস্তায় নামানোর অনুমতি নিতে হয়। পরে প্রতিমাসে ধার্য করা টোকেন মানি দিয়ে সড়কে চলাচল করতে হয়।

জানা যায়, সন্দ্বীপে একটি হিরো স্প্লেন্ডার বাইক ৬০-৭০ হাজার টাকা, ডিসকভার ৭০-৮০ হাজার, পালসার ৯০ থেকে এক লাখ টাকায় বিক্রি হয়।

দীর্ঘদিন ধরে মোটরসাইকেলে ভাড়ায় যাত্রী আনা-নেওয়া করেন রহমতপুর এলাকার বাসিন্দা দিদার। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রতিমাসে আমরা টোকেন মানি দেওয়ার পরও পুলিশ আমাদের হয়রানি করে। থানার টাকা পয়সার প্রয়োজন হলেই তারা মোটরসাইকেল আটক করে। পরে ১০-১৫ হাজার টাকা করে নিয়ে মোটরসাইকেল ছেড়ে দেয়। সর্বশেষ তিন মাস আগে সাবেক ওসি যাওয়ার সময় ৮০-৯০টি মোটরসাইকেল আটক করে। পরে টাকা-পয়সা নিয়ে ওই মোটরসাইকেলগুলো ছেড়ে দেয়। ওসিরা সন্দ্বীপ ছেড়ে যাওয়ার সময় প্রায়ই এ কাজ করে।’

পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত তানভীর হোসেন নামে আরও এক যুবক বলেন, ‘আমাদের পাঁচটি সিএনজি অটোরিকশা আছে। এগুলোর প্রতিটির জন্য প্রতিমাসে থানায় ২০০ টাকা করে দিতে হয়। এর বাইরে প্রতিমাসে এক দুই বার থানার ডিউটি পালন করতে হয়।’ প্রতিমাসে টাকা এবং ডিউটি পালন করার পরও মাঝে মধ্যে গাড়ি আটকে পুলিশ সদস্যরা বাড়তি টাকা আদায় করেন বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

সন্দ্বীপ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখানে যেসব মোটরযান চলে এগুলোর অধিকাংশেরই লাইসেন্স নেই। চোরাইপথে আনা গাড়িগুলো এই দ্বীপ উপজেলায় চালানো হয়। কিছু দিন পর পর আমরা অভিযান চালিয়ে গাড়িগুলো ধরি। কিন্তু এরপরও কেউ লাইসেন্স করে না।’

তবে টোকেন বাণিজ্যের বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমি তিন মাস আগে এই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছি। টোকেন দেওয়ার বিনিময়ে টাকা নেওয়া হয় কিনা এ ব্যাপারে আমি বলতে পারবো না।’

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. নুরুল হুদা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সম্প্রতি আমি এই উপজেলার দায়িত্ব পেয়েছি। বিষয়টি সম্পর্কে আমি এখনও অবগত নই। আপনার আগে আরও দু’একজনের কাছ থেকে এরকম তথ্য পেয়েছি। আমি খোঁজ নিয়ে দেখবো গাড়িগুলো কিভাবে চলে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখানে বিআরটিএ নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন চাইলেই এটি রোধ করতে পারবে না। এটি বন্ধে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সহযোগিতার হাত নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।’

সূত্র:    Bangla Tribune

About tvsandwip

Check Also

দ্বীপবন্ধুকে ছাড়িয়ে গেলেন ছেলে দ্বীপরত্ন : এমপি মিতার হ্যাট্রিক বিজয়

খাদেমুল ইসলাম, সন্দ্বীপ(চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি, ২৩:১৭ পি.এম দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় আজ বরিবার। চট্টগ্রাম …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *